💉ভ্যাকসিনেশন : কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা ‼️"
ভ্যাকসিন। আমজনতার ভাষায় বললে, টিকা। আমরা ছোটবেলা থেকে সবাই ই নিশ্চিতভাবে পরিচিত এর সাথে।শিশুর জন্মের এক বছরের মধ্যেই তাকে ছয়টি মারাত্মক রোগের টিকা দিতে হয়-যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সূত্রে কারোর ই বোধ করি অজানা নয় এর কথা।কি থাকে এই ভ্যাকসিনে? কেনোই বা নেবো এসব? এই লেখাতে আলোচনা করবো সেটাই।
প্রথমে আসি টিকা বা ভ্যাকসিন জিনিসটা কি। এক কথায় ভ্যাকসিন হল এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ বা মিশ্রণ যা অ্যান্টিবডি তৈরী হওয়ার প্রক্রিয়াকে উত্তেজিত করে দেহে কোন একটি রোগের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা জন্মাতে সাহায্য করে ।কোন রোগের টিকা হল কেবলমাত্র সেই নির্দিষ্ট রোগটিরই বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বর্ধনকারী ক্রিয়া সম্পন্ন জৈব উপাচার যা টিকাকরণ (ইনঅক্যুলেশন) অর্থাৎ ত্বকে সূচ ফুটিয়ে দেওয়া হতে পারে বা অন্য উপায়ে যেমন খাবার ড্রপ হিসেবে দেওয়া হতে পারে।আরো সহজ করে বলতে হলে, অল্প ভয়ংকর কিছু দিয়ে অতি ভয়ংকর কিছু থেকে পরিত্রাণ পাওয়া। যাহোক, অনেকগুলো নতুন বিষয় চলে এলো, সেগুলোকে আগে ডিফাইন করা প্রয়োজন। প্রথমে দেওয়া সংজ্ঞাটায় যে অনাক্রম্যতার কথা বলা হয়েছে, সেটা দিয়েই শুরু করি। অনাক্রম্যতা বলতে বোঝানো হচ্ছে ইমিউনিটিকে, অর্থ্যাৎ দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে।আমরা দেখি আমাদের শহুরে এপার্টমেন্ট গুলোতে নিরাপত্তার জন্য থাকে দারোয়ান, সিসিটিভি ইত্যাদি।সামর্থ্যবান হলে ইলেক্ট্রনিক এলার্ম, লেজার, বায়োমেট্রিক সেন্সর ও ব্যবহার করতে পারেন কেউ কেউ। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে আমাদের ঘর , ঘরের ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র এবং প্রিয়জনদেরকে অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব থেকে দূরে রাখা।
আমাদের দেহেরও এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে যা নানান বিপদ আপদ থেকে আমাদেরকে সুরক্ষা দেয়। আমাদের হাড্ডি, চামড়া এসব দেহের ভেতরের গুরুত্বপূর্ন অঙ্গকে রক্ষা করে।তবে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তার কাজটি হয়ে থাকে নিঃশব্দে, গোপনে। যা আমরা দেখিনা, অনুভব করি না, কিন্তু যেটা আছে বলেই আমরা সুস্থ আছি এবং অসুস্থ হয়ে পড়লেও আবার সুস্থ হচ্ছি। এইটাই হলো আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা(Immune System)।আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থায় বিশেষ বিশেষ ধরনের কিছু কোষ রয়েছে, যাকে বলা হয় অনাক্রম্য কোষ।আমাদের রক্তের শ্বেতকণিকা(Leukocyte) অনাক্রম্য ব্যবস্থার একটি সক্রিয় সৈনিক। নিউট্রোফিল, ম্যাক্রোফাজ, লিম্ফোসাইট,ডেন্ড্রাইটিক সেল এগুলো উল্লেখযোগ্য অনাক্রম্য কোষ।যাহোক, দেহের ইমিউন সিস্টেম আমাদের মূল আলোচ্য নয়, কাজেই সেদিকে বেশি যাবো না।যেটা দরকার তা হলো, দেহে B-cell নামে একধরণের কোষ থাকে,যারা একবার কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সেই জীবাণুর চেহারাটা চিনে রাখে(এজন্য এদের বলা হয় Memory B-cell) ।ভবিষ্যতে সেই একই চেহারার জীবাণু দেহে প্রবেশ করা মাত্রই B-cell গুলো ম্যাক্রোফাজের মতো কিছু খাদক কোষ বা রোগ প্রতিরোধী কোষ ডেকে নিয়ে এসে জীবাণুকে ধ্বংস করে দেয়।একটা কথা বলে রাখা দরকার এখানে,সেটা হলো দেহের অনাক্রম্য ব্যবস্থা যদি কোনো কিছুকে বহিরাগত জীবাণু হলে শনাক্ত করে, তবে সে এগুলোকে ধ্বংস করতে একধরণের পুলিশ ছেড়ে দেয়, যেগুলোকে বলা হয় অ্যান্টিবডি। এগুলোই মূলত অাগন্তুক জীবাণুকে নিধন করে। (এখানে উল্লেখ্য যে, B-cell এর মতো ডেনড্রাইটিক সেলগুলোও এই চিনিয়ে দেয়ার কাজটা করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরকম কোষ রয়েছে বহু, যাদের কথা হয়তো বলে শেষ করা যাবে না,এখানে শুধু একটি উল্লেখ করা হলো।)ভালো করলে খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন যে এই চিনে ফেলা এবং তাকে ধ্বংস করার বিষয়টা কিন্তু অনাক্রম্য ব্যবস্থার একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য! আপনি কোন জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পরও অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে মনে রাখতে পারে। যার ফলে পরে আবার ওই জীবাণু বা ওর কাছাকাছি চেহারার কোনো জীবাণুর দেখা পেলেই ক্যাচ কট কট! সে আর রোগ সৃষ্টি করতে পারেনা।একে একটা সুন্দর গালভরা নামে ডাকা হয়, সেটা হলো-অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত স্মৃতি(Immunological memory)। যদিও এই স্মৃতি আপনাকে একই জীবাণুর বার বার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু নতুন জীবাণুর সময় সে আর সাহায্য করতে পারবেনা ।প্রতিটা নতুন জীবাণুর আক্রমণে অনাক্রম্য ব্যবস্থা যেন নতুন জীবাণুটিকে মনে রাখতে পারে,সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে বারবার যেতে হয়। প্রতিদিনই আমাদের শরীরে হাজার হাজার জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে আমরা বড় হয়ে গেলে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা কোটি কোটি জীবাণুকে মুখস্থ করে ফেলে।এখানেই আসলে টিকা বা ভ্যাকসিনের মাহাত্ম্য। টিকা আসলে কিছুই না, যে রোগের টিকা সেই রোগেরই মৃতপ্রায় বা মৃত জীবাণু অথবা তার বিষ থেকে তৈরী হওয়া রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু-সদৃশ উপাদান।মৃত বলতে বোঝাচ্ছি যে, এদের কোনো সক্রিয়তা থাকে না, তবে দেহের অনাক্রম্যতন্ত্র একে চিনে নেবার সুযোগ পায়।এর ফলে একটা দারুণ ঘটনা ঘটে-একদিকে যেমন কোনো রোগ সৃষ্টি হয়না,তেমনি দেহের অনাক্রম্য কোষগুলোও এতে সক্রিয় হয়ে যায় এবং যেকোনো ধরণের জীবাণু আক্রমণকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়ে যায়।ব্যাপারটাকে আরেকটু সহজ করি।ধরুন, কোনো একটা ছিঁচকে চোর একটা ডায়মন্ডের দোকানে চুরি করার পরিকল্পনা করছে। একসময় সে অনেক চিন্তাভাবনা করে দোকানে ঢুকলো, কিন্তু তখন দোকানেরই এক কর্মী টুক করে স্থানীয় থানায় কল করে দিলো।তৎক্ষণাৎ ওসি সাহেব তার দলবল নিয়ে হাজির হয়ে গেলেন, ধরেও ফেললেন ছিঁচকে চোরটাকে। ডায়মন্ডের দোকান, হররোজ লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে, সেখানে চুরি! পুলিশ তো নড়েচড়ে বসবেই। ডায়মন্ডের দোকানে কিছু তাগরাই চেহারার আর্মড-কনস্টেবল নিয়োগ দেয়া হলো,সাথে দেয়া হলো সাদা-পোশাকের পুলিশ। ঘটনাচক্রে তার পরদিনই ঐ দোকানে আক্রমণ করে বসলো কুখ্যাত ডাকাত কালু খাঁ ও তার দলবল।কালুর দলতো আর জানে না ওখানে আগে থেকেই রেডি আছে পুলিশের লোকজন! সে আসার পর পরই আর্মড পুলিশ ধরে ফেলে লকাপে পুরলো তাদের। বুঝলেন পুরো ঘটনাটা? ছিঁচকে চোরটাকে ধরুন ভ্যাকসিন হিসেবে দেয়া মৃত জীবাণুগুলো হিসেবে,পুলিশকে দেহের অনাক্রম্য কোষ হিসেবে আর ডাকাতগুলোকে বিবেচনা করুন যে জীবাণু প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে সেগুলো হিসেবে- তাহলেই সবকিছু একদম ঝকঝকা তকতকা(বলে আশা করি!)।
ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ইতিহাসটা এইক্ষণে না বললেই না। এই গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং।আঠারোশ' শতকের ইংল্যান্ডের কথা। "বৃটেন কখোনো সূর্যাস্ত দেখে না"-সেই যুগ তখন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই তখন আকাশে-বাতাসে "গড সেভ দা কুইন"।এধরণের একটা প্রতাপশালী অবস্থাতেও বৃটিশদের মনে ভয়ের সঞ্চার ঘটিয়ে ছিলো গুটিবসন্ত- এ রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু তখন প্রায় অবধারিত- আর শুধু তাই নয়, রোগটি ছোঁয়াচে হওয়ায় এর ভয়াবহতা ছিলো আরো বেশি। তদানীন্তন সময়ে ভ্যারিওলেশন নামক একটি থেরাপি পদ্ধতির প্রচলন ছিলো। গুটিবসন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে শুকিয়ে যাওয়া মৃত চামড়া একজন সুস্থ ব্যক্তির গায়ে সামান্য পরিমাণে ঘষে দেয়া হতো। এতে সুস্থ ব্যক্তি অল্পমাত্রায় গুটিবসন্তে আক্রান্ত হতো, যা তার শরীর সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারতো। তবে, সমস্যা টা হলো যেহেতু এখানে গুটিবসন্তের জীবাণুটিকেই শরীরে ঢোকানোর ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে, তাই অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যেতো কাঙ্খিত ফল তো আসতোই না, বরং বড়সড় গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে পড়তো তারা।সেসময় গ্লস্টারশায়ারে বাস করতেন একজন ইংরেজ চিকিৎসক। নাম তার এডওয়ার্ড জেনার।তিনি দেখলেন যে সেসময় গবাদিপশুর দেহে অনুরূপ একটি বসন্ত রোগ দেখা দিতো, যার নাম cow pox. সেই কাউপক্সের জীবাণু যদি কোনো মানুষের শরীরে কোনোভাবে চলে আসতো, তবে খুব সামান্য একধরণের বসন্ত রোগ হতো ঐ ব্যক্তির, যা থেকে খুব দ্রুতই আরোগ্য লাভ করা যেতো। গরুর যদি এই পক্স থাকে, তাহলে কোন মানুষদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ থাকতে পারে ? অবশ্যই খামারিদের, বা দুধওয়ালাদের। জেনার সাহেব দেখেছিলেন যেসকল যেসকল দুধওয়ালা ইতিমধ্যেই কাউপক্সে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের আর গুটিবসন্ত হয় না। তিনি ধারণা করেছিলেন এই দুটি রোগের জীবাণু হয়তো খুব কাছাকাছি ধরণের। একটি হয়তো সামান্য জ্বর সৃষ্টিকারী,কিন্তু অপরটি প্রাণঘাতী। জেনার সাহেব তখন চালালেন এক মারাত্মক পরীক্ষা। তার বাড়িতে যিনি দুধ দিতে আসতেন, তার নাম ছিলো সারা-তিনি(সারা) ছিলেন কাউপক্সে আক্রান্ত। জেনার সারার শরীর থেকে খানিকটা কাউপক্সের পুঁজ নিয়ে তার মালীর সুস্থ আট বছরের ছেলে জেমস ফিলিপের ত্বকে ঘষে দিলেন।দেখা গেলো, বসন্তের কিছু উপসর্গের পর সে আবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং গুটি বসন্তের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।এখন আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি ঠিক কি ঘটেছিলো এখানে। কাউপক্সের জীবাণু জেমসের শরীরে প্রবেশ করলে, সেখানকার রোগ প্রতিরোধী কোষগুলো অ্যান্টিবডি তৈরী করে তাকে ধ্বংস করে দেয়। এই কোষগুলোই যখন দ্বিতীয়বার গুটিবসন্তের জীবাণুর অনুপ্রবেশ বুঝতে পারে, তখন অনতি বিলম্বে নিধন করে সেগুলোকে!এটাই ছিলো আধুনিক ভ্যাকসিনেশনের মূল আইডিয়া,যেমনটা উল্লেখ করেছি শিরোনামে-"কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা! "
তার এই আবিষ্কারের জন্য এডওয়ার্ড জেনার বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।তার নাম মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে প্রতিষেধকবিজ্ঞানের জনক হিসাবে। জেনারের জীবনের একটা ঘটনা দিয়েই শেষ করবো লেখাটা। বৃটেন আর ফ্রান্সের মধ্যে তখন চলছিলো তুমুল রেষারেষি। ফ্রান্সের অধিপতি তখন মহামতি নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট।তিনি এই আবিষ্কারের পর তার সেনাবাহিনীকে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন প্রদান করেন। সেই ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক জেনার সাহেবের পাঠানো একটি চিঠির প্রতি সম্মান দেখিয়ে নেপোলিয়ন তার কারাগার থেকে দুজন বৃটিশ কয়েদিকে নিংশর্ত মুক্তি প্রদান করে বলেন, "বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আবিষ্কারকের কথা ফেলে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। "
হ্যাঁ, এটাই বিজ্ঞান-দি গ্রেটেস্ট ভিক্টর অফ অল টাইম !
বিজ্ঞানের জয় হোক! 🙃
ভ্যাকসিন। আমজনতার ভাষায় বললে, টিকা। আমরা ছোটবেলা থেকে সবাই ই নিশ্চিতভাবে পরিচিত এর সাথে।শিশুর জন্মের এক বছরের মধ্যেই তাকে ছয়টি মারাত্মক রোগের টিকা দিতে হয়-যক্ষ্মা, পোলিও, ডিপথেরিয়া, হুপিং কাশি ইত্যাদি ইত্যাদি। সেই সূত্রে কারোর ই বোধ করি অজানা নয় এর কথা।কি থাকে এই ভ্যাকসিনে? কেনোই বা নেবো এসব? এই লেখাতে আলোচনা করবো সেটাই।
প্রথমে আসি টিকা বা ভ্যাকসিন জিনিসটা কি। এক কথায় ভ্যাকসিন হল এক ধরনের রাসায়নিক যৌগ বা মিশ্রণ যা অ্যান্টিবডি তৈরী হওয়ার প্রক্রিয়াকে উত্তেজিত করে দেহে কোন একটি রোগের জন্য প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অনাক্রম্যতা জন্মাতে সাহায্য করে ।কোন রোগের টিকা হল কেবলমাত্র সেই নির্দিষ্ট রোগটিরই বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা বর্ধনকারী ক্রিয়া সম্পন্ন জৈব উপাচার যা টিকাকরণ (ইনঅক্যুলেশন) অর্থাৎ ত্বকে সূচ ফুটিয়ে দেওয়া হতে পারে বা অন্য উপায়ে যেমন খাবার ড্রপ হিসেবে দেওয়া হতে পারে।আরো সহজ করে বলতে হলে, অল্প ভয়ংকর কিছু দিয়ে অতি ভয়ংকর কিছু থেকে পরিত্রাণ পাওয়া। যাহোক, অনেকগুলো নতুন বিষয় চলে এলো, সেগুলোকে আগে ডিফাইন করা প্রয়োজন। প্রথমে দেওয়া সংজ্ঞাটায় যে অনাক্রম্যতার কথা বলা হয়েছে, সেটা দিয়েই শুরু করি। অনাক্রম্যতা বলতে বোঝানো হচ্ছে ইমিউনিটিকে, অর্থ্যাৎ দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে।আমরা দেখি আমাদের শহুরে এপার্টমেন্ট গুলোতে নিরাপত্তার জন্য থাকে দারোয়ান, সিসিটিভি ইত্যাদি।সামর্থ্যবান হলে ইলেক্ট্রনিক এলার্ম, লেজার, বায়োমেট্রিক সেন্সর ও ব্যবহার করতে পারেন কেউ কেউ। এসব কিছুর মূলেই রয়েছে আমাদের ঘর , ঘরের ভেতরের মূল্যবান জিনিসপত্র এবং প্রিয়জনদেরকে অনাকাঙ্ক্ষিত উপদ্রব থেকে দূরে রাখা।
আমাদের দেহেরও এমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা আছে যা নানান বিপদ আপদ থেকে আমাদেরকে সুরক্ষা দেয়। আমাদের হাড্ডি, চামড়া এসব দেহের ভেতরের গুরুত্বপূর্ন অঙ্গকে রক্ষা করে।তবে সবচেয়ে মূল্যবান নিরাপত্তার কাজটি হয়ে থাকে নিঃশব্দে, গোপনে। যা আমরা দেখিনা, অনুভব করি না, কিন্তু যেটা আছে বলেই আমরা সুস্থ আছি এবং অসুস্থ হয়ে পড়লেও আবার সুস্থ হচ্ছি। এইটাই হলো আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা(Immune System)।আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থায় বিশেষ বিশেষ ধরনের কিছু কোষ রয়েছে, যাকে বলা হয় অনাক্রম্য কোষ।আমাদের রক্তের শ্বেতকণিকা(Leukocyte) অনাক্রম্য ব্যবস্থার একটি সক্রিয় সৈনিক। নিউট্রোফিল, ম্যাক্রোফাজ, লিম্ফোসাইট,ডেন্ড্রাইটিক সেল এগুলো উল্লেখযোগ্য অনাক্রম্য কোষ।যাহোক, দেহের ইমিউন সিস্টেম আমাদের মূল আলোচ্য নয়, কাজেই সেদিকে বেশি যাবো না।যেটা দরকার তা হলো, দেহে B-cell নামে একধরণের কোষ থাকে,যারা একবার কোনো রোগে আক্রান্ত হলে সেই জীবাণুর চেহারাটা চিনে রাখে(এজন্য এদের বলা হয় Memory B-cell) ।ভবিষ্যতে সেই একই চেহারার জীবাণু দেহে প্রবেশ করা মাত্রই B-cell গুলো ম্যাক্রোফাজের মতো কিছু খাদক কোষ বা রোগ প্রতিরোধী কোষ ডেকে নিয়ে এসে জীবাণুকে ধ্বংস করে দেয়।একটা কথা বলে রাখা দরকার এখানে,সেটা হলো দেহের অনাক্রম্য ব্যবস্থা যদি কোনো কিছুকে বহিরাগত জীবাণু হলে শনাক্ত করে, তবে সে এগুলোকে ধ্বংস করতে একধরণের পুলিশ ছেড়ে দেয়, যেগুলোকে বলা হয় অ্যান্টিবডি। এগুলোই মূলত অাগন্তুক জীবাণুকে নিধন করে। (এখানে উল্লেখ্য যে, B-cell এর মতো ডেনড্রাইটিক সেলগুলোও এই চিনিয়ে দেয়ার কাজটা করতে পারে। প্রকৃতপক্ষে এরকম কোষ রয়েছে বহু, যাদের কথা হয়তো বলে শেষ করা যাবে না,এখানে শুধু একটি উল্লেখ করা হলো।)ভালো করলে খেয়াল করলে বুঝতে পারবেন যে এই চিনে ফেলা এবং তাকে ধ্বংস করার বিষয়টা কিন্তু অনাক্রম্য ব্যবস্থার একটি চমৎকার বৈশিষ্ট্য! আপনি কোন জীবাণুর দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হবার পরও অনাক্রম্য ব্যবস্থা তাকে মনে রাখতে পারে। যার ফলে পরে আবার ওই জীবাণু বা ওর কাছাকাছি চেহারার কোনো জীবাণুর দেখা পেলেই ক্যাচ কট কট! সে আর রোগ সৃষ্টি করতে পারেনা।একে একটা সুন্দর গালভরা নামে ডাকা হয়, সেটা হলো-অনাক্রম্যতা সংক্রান্ত স্মৃতি(Immunological memory)। যদিও এই স্মৃতি আপনাকে একই জীবাণুর বার বার আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে, কিন্তু নতুন জীবাণুর সময় সে আর সাহায্য করতে পারবেনা ।প্রতিটা নতুন জীবাণুর আক্রমণে অনাক্রম্য ব্যবস্থা যেন নতুন জীবাণুটিকে মনে রাখতে পারে,সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাকে বারবার যেতে হয়। প্রতিদিনই আমাদের শরীরে হাজার হাজার জীবাণু প্রবেশ করে। এভাবে আমরা বড় হয়ে গেলে আমাদের অনাক্রম্য ব্যবস্থা কোটি কোটি জীবাণুকে মুখস্থ করে ফেলে।এখানেই আসলে টিকা বা ভ্যাকসিনের মাহাত্ম্য। টিকা আসলে কিছুই না, যে রোগের টিকা সেই রোগেরই মৃতপ্রায় বা মৃত জীবাণু অথবা তার বিষ থেকে তৈরী হওয়া রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু-সদৃশ উপাদান।মৃত বলতে বোঝাচ্ছি যে, এদের কোনো সক্রিয়তা থাকে না, তবে দেহের অনাক্রম্যতন্ত্র একে চিনে নেবার সুযোগ পায়।এর ফলে একটা দারুণ ঘটনা ঘটে-একদিকে যেমন কোনো রোগ সৃষ্টি হয়না,তেমনি দেহের অনাক্রম্য কোষগুলোও এতে সক্রিয় হয়ে যায় এবং যেকোনো ধরণের জীবাণু আক্রমণকে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিহত করতে সক্ষম হয়ে যায়।ব্যাপারটাকে আরেকটু সহজ করি।ধরুন, কোনো একটা ছিঁচকে চোর একটা ডায়মন্ডের দোকানে চুরি করার পরিকল্পনা করছে। একসময় সে অনেক চিন্তাভাবনা করে দোকানে ঢুকলো, কিন্তু তখন দোকানেরই এক কর্মী টুক করে স্থানীয় থানায় কল করে দিলো।তৎক্ষণাৎ ওসি সাহেব তার দলবল নিয়ে হাজির হয়ে গেলেন, ধরেও ফেললেন ছিঁচকে চোরটাকে। ডায়মন্ডের দোকান, হররোজ লাখ লাখ টাকার লেনদেন হচ্ছে, সেখানে চুরি! পুলিশ তো নড়েচড়ে বসবেই। ডায়মন্ডের দোকানে কিছু তাগরাই চেহারার আর্মড-কনস্টেবল নিয়োগ দেয়া হলো,সাথে দেয়া হলো সাদা-পোশাকের পুলিশ। ঘটনাচক্রে তার পরদিনই ঐ দোকানে আক্রমণ করে বসলো কুখ্যাত ডাকাত কালু খাঁ ও তার দলবল।কালুর দলতো আর জানে না ওখানে আগে থেকেই রেডি আছে পুলিশের লোকজন! সে আসার পর পরই আর্মড পুলিশ ধরে ফেলে লকাপে পুরলো তাদের। বুঝলেন পুরো ঘটনাটা? ছিঁচকে চোরটাকে ধরুন ভ্যাকসিন হিসেবে দেয়া মৃত জীবাণুগুলো হিসেবে,পুলিশকে দেহের অনাক্রম্য কোষ হিসেবে আর ডাকাতগুলোকে বিবেচনা করুন যে জীবাণু প্রতিরোধে ভ্যাকসিন দেয়া হচ্ছে সেগুলো হিসেবে- তাহলেই সবকিছু একদম ঝকঝকা তকতকা(বলে আশা করি!)।
ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ইতিহাসটা এইক্ষণে না বললেই না। এই গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং।আঠারোশ' শতকের ইংল্যান্ডের কথা। "বৃটেন কখোনো সূর্যাস্ত দেখে না"-সেই যুগ তখন। বিশ্বের প্রায় প্রতিটি প্রান্তেই তখন আকাশে-বাতাসে "গড সেভ দা কুইন"।এধরণের একটা প্রতাপশালী অবস্থাতেও বৃটিশদের মনে ভয়ের সঞ্চার ঘটিয়ে ছিলো গুটিবসন্ত- এ রোগে আক্রান্ত হলে মৃত্যু তখন প্রায় অবধারিত- আর শুধু তাই নয়, রোগটি ছোঁয়াচে হওয়ায় এর ভয়াবহতা ছিলো আরো বেশি। তদানীন্তন সময়ে ভ্যারিওলেশন নামক একটি থেরাপি পদ্ধতির প্রচলন ছিলো। গুটিবসন্ত আক্রান্ত ব্যক্তির শরীর থেকে শুকিয়ে যাওয়া মৃত চামড়া একজন সুস্থ ব্যক্তির গায়ে সামান্য পরিমাণে ঘষে দেয়া হতো। এতে সুস্থ ব্যক্তি অল্পমাত্রায় গুটিবসন্তে আক্রান্ত হতো, যা তার শরীর সহজেই কাটিয়ে উঠতে পারতো। তবে, সমস্যা টা হলো যেহেতু এখানে গুটিবসন্তের জীবাণুটিকেই শরীরে ঢোকানোর ব্যবস্থা করে দেয়া হচ্ছে, তাই অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যেতো কাঙ্খিত ফল তো আসতোই না, বরং বড়সড় গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়ে পড়তো তারা।সেসময় গ্লস্টারশায়ারে বাস করতেন একজন ইংরেজ চিকিৎসক। নাম তার এডওয়ার্ড জেনার।তিনি দেখলেন যে সেসময় গবাদিপশুর দেহে অনুরূপ একটি বসন্ত রোগ দেখা দিতো, যার নাম cow pox. সেই কাউপক্সের জীবাণু যদি কোনো মানুষের শরীরে কোনোভাবে চলে আসতো, তবে খুব সামান্য একধরণের বসন্ত রোগ হতো ঐ ব্যক্তির, যা থেকে খুব দ্রুতই আরোগ্য লাভ করা যেতো। গরুর যদি এই পক্স থাকে, তাহলে কোন মানুষদের মধ্যে এই রোগের প্রকোপ থাকতে পারে ? অবশ্যই খামারিদের, বা দুধওয়ালাদের। জেনার সাহেব দেখেছিলেন যেসকল যেসকল দুধওয়ালা ইতিমধ্যেই কাউপক্সে আক্রান্ত হয়েছেন, তাদের আর গুটিবসন্ত হয় না। তিনি ধারণা করেছিলেন এই দুটি রোগের জীবাণু হয়তো খুব কাছাকাছি ধরণের। একটি হয়তো সামান্য জ্বর সৃষ্টিকারী,কিন্তু অপরটি প্রাণঘাতী। জেনার সাহেব তখন চালালেন এক মারাত্মক পরীক্ষা। তার বাড়িতে যিনি দুধ দিতে আসতেন, তার নাম ছিলো সারা-তিনি(সারা) ছিলেন কাউপক্সে আক্রান্ত। জেনার সারার শরীর থেকে খানিকটা কাউপক্সের পুঁজ নিয়ে তার মালীর সুস্থ আট বছরের ছেলে জেমস ফিলিপের ত্বকে ঘষে দিলেন।দেখা গেলো, বসন্তের কিছু উপসর্গের পর সে আবার সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠে এবং গুটি বসন্তের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হয়।এখন আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি ঠিক কি ঘটেছিলো এখানে। কাউপক্সের জীবাণু জেমসের শরীরে প্রবেশ করলে, সেখানকার রোগ প্রতিরোধী কোষগুলো অ্যান্টিবডি তৈরী করে তাকে ধ্বংস করে দেয়। এই কোষগুলোই যখন দ্বিতীয়বার গুটিবসন্তের জীবাণুর অনুপ্রবেশ বুঝতে পারে, তখন অনতি বিলম্বে নিধন করে সেগুলোকে!এটাই ছিলো আধুনিক ভ্যাকসিনেশনের মূল আইডিয়া,যেমনটা উল্লেখ করেছি শিরোনামে-"কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা! "
তার এই আবিষ্কারের জন্য এডওয়ার্ড জেনার বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন।তার নাম মানুষ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে প্রতিষেধকবিজ্ঞানের জনক হিসাবে। জেনারের জীবনের একটা ঘটনা দিয়েই শেষ করবো লেখাটা। বৃটেন আর ফ্রান্সের মধ্যে তখন চলছিলো তুমুল রেষারেষি। ফ্রান্সের অধিপতি তখন মহামতি নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট।তিনি এই আবিষ্কারের পর তার সেনাবাহিনীকে গুটিবসন্তের ভ্যাকসিন প্রদান করেন। সেই ভ্যাকসিনের আবিষ্কারক জেনার সাহেবের পাঠানো একটি চিঠির প্রতি সম্মান দেখিয়ে নেপোলিয়ন তার কারাগার থেকে দুজন বৃটিশ কয়েদিকে নিংশর্ত মুক্তি প্রদান করে বলেন, "বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী আবিষ্কারকের কথা ফেলে দেয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। "
হ্যাঁ, এটাই বিজ্ঞান-দি গ্রেটেস্ট ভিক্টর অফ অল টাইম !
বিজ্ঞানের জয় হোক! 🙃


